
এশিয়ায় বাণিজ্যের নতুন দিগন্ত, সুযোগ কাজে লাগাতে প্রস্তুত কি বাংলাদেশ?
বিশ্ব অর্থনীতির কেন্দ্র ক্রমেই এশিয়ার দিকে সরে আসছে। উৎপাদন, প্রযুক্তি, বিনিয়োগ ও আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে এশিয়ার প্রভাব বিস্তারের সঙ্গে সঙ্গে বদলে যাচ্ছে বৈশ্বিক অর্থনৈতিক সম্পর্কের পুরোনো সমীকরণ। চীন, ভারত, জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়ার মতো অর্থনৈতিক শক্তির পাশাপাশি দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোও শিল্পায়ন, অবকাঠামো উন্নয়ন এবং আঞ্চলিক সরবরাহব্যবস্থায় নিজেদের অবস্থান সুদৃঢ় করছে। এই পরিবর্তন বাংলাদেশের জন্য যেমন নতুন সম্ভাবনার দুয়ার খুলছে, তেমনি প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়ার ঝুঁকিও বাড়াচ্ছে। প্রশ্ন হচ্ছে, এশিয়ার অর্থনৈতিক উত্থানের এই গুরুত্বপূর্ণ সময়ে বাংলাদেশ কি নিজের উৎপাদন সক্ষমতা, রপ্তানি কৌশল ও বাণিজ্যিক সম্পর্ককে নতুন বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করে তুলতে পারছে?
সাম্প্রতিক বাণিজ্য পরিসংখ্যান বাংলাদেশের জন্য সতর্কবার্তা দিচ্ছে। ২০২৬ খ্রিস্টাব্দের প্রথম নয় মাসে এশিয়া-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অর্থনৈতিক সহযোগিতা সংস্থার (এপেক) অন্য সদস্য দেশগুলোর সঙ্গে চীনের বাণিজ্য বেড়েছে ২৩ দশমিক ৯ শতাংশ। একইসময়ে উচ্চপ্রযুক্তিপণ্যের বাণিজ্যে প্রবৃদ্ধি হয়েছে ৫০ দশমিক ৩ শতাংশ। বিপরীতে ইউরোপীয় ইউনিয়নের বাজারে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক রপ্তানি কমেছে এবং যুক্তরাষ্ট্রের বাজারেও রপ্তানিতে নিম্নমুখী প্রবণতা দেখা গেছে। বাংলাদেশের রপ্তানি আয়ের প্রধান দুটি গন্তব্যে এমন চাপ তৈরি হওয়ার অর্থ হলো, দীর্ঘদিনের পরিচিত বাজার ও পণ্যের ওপর নির্ভর করে ভবিষ্যতের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি নিশ্চিত করা ক্রমেই কঠিন হয়ে পড়ছে। বাংলাদেশের রপ্তানি অর্থনীতির সবচেয়ে বড় দুর্বলতা পণ্য বহুমুখীকরণের অভাব। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে মোট রপ্তানি আয়ের ৮০ দশমিক ৬২ শতাংশ এসেছে তৈরি পোশাকখাত থেকে। কর্মসংস্থান, বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন এবং শিল্পায়নে এই খাতের অবদান অনস্বীকার্য। কিন্তু একটি দেশের রপ্তানি আয়ের সিংহভাগ যখন একটি শিল্পের ওপর নির্ভরশীল থাকে, তখন বৈশ্বিক চাহিদার পরিবর্তন, শুল্কনীতি, ক্রেতাদের ক্রয়াদেশ হ্রাস কিংবা প্রতিযোগী দেশের উৎপাদন সক্ষমতা বৃদ্ধির প্রভাব গোটা অর্থনীতিতে ছড়িয়ে পড়ে। বাংলাদেশের বর্তমান পরিস্থিতি সেই ঝুঁকিরই প্রতিফলন। তাই তৈরি পোশাকশিল্পখাতকে আরও শক্তিশালী করার পাশাপাশি নতুন রপ্তানিখাত গড়ে তোলাই হতে হবে জাতীয় অর্থনৈতিক কৌশলের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য। চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য, পাট ও পাটজাত সামগ্রী, প্রক্রিয়াজাত খাদ্য, ওষুধ, হালকা প্রকৌশল, ইলেকট্রনিক যন্ত্রাংশ, কৃষিপণ্য এবং তথ্যপ্রযুক্তিনির্ভর সেবায় বাংলাদেশের সম্ভাবনা রয়েছে। এসব সম্ভাবনাকে বাস্তব রপ্তানি আয়ে রূপ দিতে প্রয়োজন গবেষণা, প্রযুক্তি, দক্ষ জনবল, মান নিয়ন্ত্রণ এবং আন্তর্জাতিক বাজার সম্পর্কে নির্ভরযোগ্য তথ্য। শুধু উৎপাদন বাড়ালেই হবে না; কোন দেশে কোন পণ্যের চাহিদা বাড়ছে, ক্রেতারা কী মান চাইছেন, প্রতিযোগীরা কী দামে পণ্য সরবরাহ করছে এবং বাজারে প্রবেশের শর্ত কী এসব বিষয়ে রপ্তানিকারকদের কার্যকর সহায়তা দিতে হবে।
চীন ও ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের বাণিজ্যিক সম্পর্কের দিকে তাকালেও সমস্যাটির গভীরতা বোঝা যায়। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে চীন থেকে বাংলাদেশ প্রায় ১ হাজার ৮৫৬ কোটি ডলারের পণ্য আমদানি করলেও রপ্তানি করেছে মাত্র ৬৯ কোটি ৪৪ লাখ ডলারের। একই সময়ে ভারতের সঙ্গে আমদানি ও রপ্তানির ব্যবধানও ছিল উল্লেখযোগ্য। অবশ্য এই ঘাটতির পুরোটা নেতিবাচক হিসেবে দেখা সমীচীন নয়। চীন ও ভারত থেকে আমদানি করা কাঁচামাল, যন্ত্রপাতি, তুলা, সুতা, কাপড় এবং শিল্পের বিভিন্ন উপকরণ বাংলাদেশের উৎপাদন ও রপ্তানি কার্যক্রম সচল রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। ফলে নির্বিচারে আমদানি কমানোর পরিবর্তে রপ্তানির সক্ষমতা বাড়ানো, দেশীয় শিল্পের উৎপাদনশীলতা উন্নত করা এবং আমদানিকৃত প্রযুক্তিকে কাজে লাগিয়ে উচ্চমূল্যসংযোজিত পণ্য উৎপাদনের ওপর গুরুত্ব দিতে হবে। চীন ও ভারতের বিশাল বাজার বাংলাদেশের জন্য একইসঙ্গে সুযোগ ও প্রতিযোগিতার ক্ষেত্র। বিপুল জনগোষ্ঠী, ক্রমবর্ধমান মধ্যবিত্তশ্রেণি, দ্রত নগরায়ণ এবং ডিজিটাল বাণিজ্যের সম্প্রসারণ এসব দেশে নতুন পণ্যের চাহিদা সৃষ্টি করছে। বাংলাদেশের প্রক্রিয়াজাত খাদ্য, ওষুধ, পাটজাত পণ্য, চামড়াজাত সামগ্রী ও নির্বাচিত হালকা প্রকৌশল পণ্য সেখানে বাজার পেতে পারে। কিন্তু বাজারের বিশালত্ব দেখেই রপ্তানি বাড়বে না। পণ্যের মান, মূল্য, সরবরাহের নির্ভরযোগ্যতা, পরিবহন ব্যয়, শুল্ক ও অশুল্ক বাধা সম্পর্কে বাস্তবভিত্তিক প্রস্তুতি থাকতে হবে। পাশাপাশি ভারত ও চীনের বিভিন্ন অঞ্চলের ভিন্ন ভিন্ন ভোক্তাচাহিদা বিবেচনায় নিয়ে দেশভিত্তিক ও পণ্যভিত্তিক বিপণন পরিকল্পনা গড়ে তুলতে হবে। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার আসিয়ানভুক্ত দেশগুলোর ক্ষেত্রেও একই বাস্তবতা প্রযোজ্য। ইন্দোনেশিয়া, মালয়েশিয়া, ভিয়েতনাম, ফিলিপাইন, কম্বোডিয়া ও সিঙ্গাপুরের বাজারে বাংলাদেশের খাদ্যপণ্য, ওষুধ, পোশাক এবং অন্যান্য ভোগ্যপণ্য রপ্তানির সুযোগ রয়েছে। কিন্তু উচ্চশুল্ক, বাণিজ্যচুক্তির সীমাবদ্ধতা, সনদের গ্রহণযোগ্যতা এবং বাজারে প্রবেশের জটিলতা রপ্তানিকারকদের প্রতিযোগিতা কমিয়ে দিচ্ছে। প্রতিদ্বন্দী দেশগুলো যখন বিভিন্ন আঞ্চলিক ও দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যচুক্তির সুবিধা নিয়ে বাজার সম্প্রসারণ করছে, তখন বাংলাদেশের পিছিয়ে থাকা আত্মঘাতী হতে পারে। এখানে সরকারের দায়িত্ব কেবল ব্যবসায়ীদের সমস্যার কথা শোনা নয়; সমস্যার সমাধানে সময়বদ্ধ উদ্যোগ নেওয়া। আসিয়ানভুক্ত দেশগুলোর সঙ্গে সম্ভাব্য বাণিজ্যচুক্তি, অগ্রাধিকারমূলক বাজারসুবিধা কিংবা অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব চুক্তির সম্ভাব্যতা যাচাই করতে হবে। তবে কোনো চুক্তিতে যাওয়ার আগে দেশীয় শিল্পের সক্ষমতা, সম্ভাব্য আমদানি বৃদ্ধি, রাজস্বের ওপর প্রভাব এবং দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক সুফল পর্যালোচনা করা জরুরি। দর-কষাকষিতে বাংলাদেশের কৃষি, ওষুধ, খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ, তৈরি পোশাক এবং সেবাখাতের স্বার্থ রক্ষা করতে হবে। একইসঙ্গে বাংলাদেশি হালাল সনদ ও অন্যান্য মানসনদের আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি বাড়াতে সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর কর্তৃপক্ষের সঙ্গে কার্যকর আলোচনা প্রয়োজন।
সম্পূর্ণ সংবাদ ও সর্বশেষ তথ্যের জন্য মূল প্রকাশনায় দেখুন।
মূল সংবাদ দেখুন ↗