
এইচএসসিতে ফল বিপর্যয়: শিক্ষার্থীদের ব্যর্থতা, নাকি ব্যবস্থার সংকট?
২০২৬ খ্রিস্টাব্দের এইচএসসি ও সমমান পরীক্ষার ফলাফল দেশের শিক্ষাব্যবস্থার গভীর অসুস্থতার একটি উদ্বেগজনক চিত্র সামনে নিয়ে এসেছে। ১১টি শিক্ষা বোর্ডে পাসের হার মাত্র ৫২ দশমিক ১২ শতাংশ। গত ২২ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন এই ফলাফলে ১২ লাখ ৪০ হাজার ৭৯৮ জন পরীক্ষার্থীর মধ্যে অকৃতকার্য হয়েছে ৫ লাখ ৯৪ হাজার ১১৩ জন। জিপিএ-৫ পেয়েছে মাত্র ৪০ হাজার ৮৪ জন, অথচ গত বছর এই সংখ্যা ছিল ৬৯ হাজার ৯৭। আরও উদ্বেগের বিষয়, ২৯৩টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে একজন শিক্ষার্থীও উত্তীর্ণ হতে পারেনি। ইংরেজি ও তথ্যপ্রযুক্তি বিষয়ে বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থীর ব্যর্থতা, মানবিক বিভাগের শিক্ষার্থীদের করুণ ফল এবং শহর ও গ্রামের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মধ্যে বৈষম্য মিলিয়ে এবারের ফলাফল আমাদের শিক্ষাব্যবস্থার কাঠামোগত দুর্বলতার একটি নির্মম দিক স্পষ্ট করেছে। প্রশ্ন হচ্ছে, এই বিপর্যয়ের দায় কি শুধু শিক্ষার্থীদের? যারা পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে পারেনি, তাদের প্রস্তুতির ঘাটতি নিশ্চয়ই ছিল। কিন্তু সেই ঘাটতি তৈরি হওয়ার পেছনে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, শিক্ষক, পাঠদানপদ্ধতি, শিক্ষাপ্রশাসন এবং রাষ্ট্রীয় নীতিনির্ধারণের দায় কতটুকু, সেই প্রশ্ন এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই।
অতীতে পাসের হার ও জিপিএ-৫ বাড়িয়ে দেখানোর প্রবণতা, অটোপাস, সংক্ষিপ্ত সিলেবাস কিংবা নম্বর প্রদানে অযাচিত উদারতা শিক্ষার প্রকৃত মান সম্পর্কে বিভ্রান্তি তৈরি করেছে। প্রকৃত মেধা ও যোগ্যতার মূল্যায়নে কঠোরতা প্রয়োজন। কিন্তু কঠোর মূল্যায়ন আর মানসম্মত শিক্ষার পরিবেশ নিশ্চিত করা দুটি ভিন্ন বিষয়। শিক্ষার্থীকে যথাযথভাবে শেখানো হয়নি, প্রয়োজনীয় শিক্ষক দেওয়া হয়নি, শ্রেণিকক্ষে পাঠদানের পরিবেশ নিশ্চিত করা যায়নি, ব্যবহারিক শিক্ষার অবকাঠামো তৈরি হয়নি; অথচ পরীক্ষার সময় পূর্ণাঙ্গ সিলেবাস ও অভিন্ন মানদন্ডে মূল্যায়ন করা হলো; এমন ব্যবস্থাকে ন্যায়সংগত বলা যায় না। মূল্যায়নের মান বাড়ানোর আগে শিক্ষার সুযোগ, প্রস্তুতি ও পাঠদানের মান নিশ্চিত করতে হবে। একই প্রশ্নপত্রে পরীক্ষা দিয়ে রাজধানীর নামকরা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরা যখন প্রায় শতভাগ পাস করছে, তখন দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলের কলেজগুলোতে অর্ধেকের বেশি শিক্ষার্থী কেন অকৃতকার্য হচ্ছে, তার অনুসন্ধান জরুরি। ঢাকা মহানগরীতে পাসের হার ৭৯ দশমিক ৩৩ শতাংশ, অথচ অনেক জেলায় তা ৫০ শতাংশের নিচে। এই ব্যবধান প্রমাণ করে, শিক্ষার্থীদের মেধার চেয়ে শিক্ষার সুযোগ ও পরিবেশের বৈষম্য অনেক ক্ষেত্রে বড় নিয়ামক হয়ে উঠেছে। রাষ্ট্র যদি সবার জন্য সমান মানের শিক্ষা নিশ্চিত করতে না পারে, তাহলে অভিন্ন মূল্যায়নের নামে বৈষম্যকে আরও প্রকট করে তোলা হবে।
এবার ইংরেজিতে অকৃতকার্য হয়েছে ২ লাখ ৪৩ হাজার ৫২৮ জন এবং আইসিটিতে ১ লাখ ৩৮ হাজার ৪৯৩ জন। দুটি বিষয়ে অনুত্তীর্ণ শিক্ষার্থীর সম্মিলিত সংখ্যা ৩ লাখ ৮২ হাজার ২১। ইংরেজি আন্তর্জাতিক যোগাযোগ, উচ্চশিক্ষা, গবেষণা ও কর্মসংস্থানের গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম। অন্যদিকে আইসিটি আধুনিক জ্ঞানভিত্তিক অর্থনীতি, ডিজিটাল সেবা, প্রযুক্তিনির্ভর কর্মসংস্থান ও উদ্ভাবনের ভিত্তি। অথচ এই দুটি মৌলিক বিষয়ে এত বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থীর দুর্বলতা আমাদের ভবিষ্যৎ মানবসম্পদ উন্নয়নের জন্য অশনিসংকেত। এর দায় শুধু শিক্ষার্থীদের ওপর চাপানো যাবে না। বহু শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ইংরেজি ও আইসিটির পর্যাপ্ত বিষয়ভিত্তিক শিক্ষক নেই। কোথাও অন্য বিষয়ের শিক্ষক দিয়ে পাঠদান করা হচ্ছে, কোথাও আইসিটি ল্যাব থাকলেও প্রয়োজনীয় কম্পিউটার, ইন্টারনেট, বিদ্যুৎ ও দক্ষ পরিচালকের অভাব রয়েছে। বাস্তবে কম্পিউটার ব্যবহারের সুযোগ না পেয়ে একজন শিক্ষার্থী কীভাবে প্রযুক্তিগত দক্ষতা অর্জন করবে? ইংরেজি শিক্ষার ক্ষেত্রেও মুখস্থনির্ভর ব্যাকরণ, গাইডবই ও পরীক্ষাকেন্দ্রিক প্রস্তুতি শিক্ষার্থীদের ভাষাগত দক্ষতা তৈরি করতে পারছে না। তাই ইংরেজি শিক্ষাকে অনুবাদ ও মুখস্থনির্ভরতা থেকে বের করে শোনা, বলা, পড়া ও লেখার সমন্বিত অনুশীলনে নিয়ে যেতে হবে। প্রতিটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ব্যবহারিক ইংরেজি চর্চার পরিবেশ, ভাষা ক্লাব, নিয়মিত মূল্যায়ন এবং দক্ষ শিক্ষক নিশ্চিত করতে হবে। আইসিটি শিক্ষাকে শুধু তাত্তিক পরীক্ষার বিষয় না রেখে হাতে-কলমে শেখার সুযোগ দিতে হবে। প্রতিটি কলেজে সচল কম্পিউটার ল্যাব, নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ, ইন্টারনেট এবং প্রশিক্ষিত শিক্ষক নিশ্চিত করা এখন মৌলিক প্রয়োজন।
সম্পূর্ণ সংবাদ ও সর্বশেষ তথ্যের জন্য মূল প্রকাশনায় দেখুন।
মূল সংবাদ দেখুন ↗