হবিগঞ্জে শিল্পদূষণে ধুঁকে ধুঁকে মরছে সুতাং নদী

সংবাদ থেকে
স্টাফ রিপোর্টার ॥ হবিগঞ্জের সুতাং নদী ভারত ও বাংলাদেশের একটি গুরুত্বপূর্ণ আন্তঃসীমান্ত নদী। এক সময় সতাং নদী ছিল একটি সমৃদ্ধ, খরস্রোতা ও জীবন্ত জলপথ। সেই সুতাং নদী নাব্য সংকটে এখন মরা খালে পরিণত হয়েছে। নদীটির চিহ্ন মুছে যাওয়ার উপক্রম হয়ে পড়েছে। এতে স্বচ্ছ পানির কোনো অস্তিত্ব নেই বললেও চলে। যেটুকু আছে, কুচকুচে কালো হয়ে উঠেছে শিল্পপ্রতিষ্ঠানের দূষণে। পরিবেশ দূষণের দায়ে হাইকোর্টের নির্দেশে মাধবপুরে সম্প্রতি বন্ধ করে দেওয়া হয় ড্রাই স্টার্চ পাউডার উৎপাদনকারী মার লিমিটেড। তবে জেলার শায়েস্তাগঞ্জের শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোর দূষণ ঠেকাতে নেই ব্যবস্থা। এতে ধুঁকে ধুঁকে মরছে সুতাং নদ। সুতাং নদের উৎপত্তিস্থল ভারতের ত্রিপুরায়। সেখান থেকে ৮২ কিলোমিটার দীর্ঘ এই নদ প্রবাহিত হয়ে জেলার চুনারুঘাট, হবিগঞ্জ সদর ও লাখাই উপজেলার উপর দিয়ে কুশিয়ারা নদীর সঙ্গে মিশেছে। এই তিন উপজেলার শতাধিক গ্রামের কৃষিজীবি মানুষের জীবিকা এই নদীর উপর নির্ভরশীল ছিল। সংশ্লিষ্ট ঊর্ধ্বতন কর্তৃপকক্ষ ও জনপ্রতিনিধিদের নজরদারির অভাবে বহমান এ নদীটি কালের আবর্তে বিলীন হতে চলেছে। শিল্পদূষণের পাশাপাশি পাহাড়ী ঢল ও অতি বর্ষণের ফলে ভারত থেকে আসা উজানের পানি ও পলিমাটিতে ভরাট হয়ে নাব্যতা হারিয়েছে নদীটি। বর্তমানে সুতাং নদের পানি এখন কুচকুচে কালো। দুর্গন্ধে নদের পাড় ধরে হাঁটার উপায় নেই। শুকনো মওসুমে নদের পানি সেচকাজে ব্যবহার করা যাচ্ছে না। এরপরও যাঁরা বাধ্য হয়ে ব্যবহার করছেন, তাঁদের চর্মরোগসহ নানা অসুখ দেখা দিয়েছে। মরে যাচ্ছে নদের মাছ। বর্ষ মওসুমে এর দুষিত পানি হাওরে হাওরে প্রবেশ করায় হাওরের মাছগুলো মারা যাচ্ছে। এতে এলাকায় দেশীয় মাছের তীব্র সংকট সৃষ্টি হয়েছে। ১০/১১ বছর আগে শায়েস্তাগঞ্জ উপজেলার অলিপুর এলাকায় ১৪-১৫টি শিল্পকারখানা গড়ে উঠে। অভিযোগ রয়েছে, এসব প্রতিষ্ঠান পার্শ্ববর্তী সদর উপজেলার শৈলজুরা এলাকার খালে বর্জ্য ফেলছে। ৮/৯ বছর আগে জেলা প্রশাসন এসব শিল্পপ্রতিষ্ঠানকে সুবিধা দিতে তিন কিলোমিটারের খালটির দৈর্ঘ্য আরও দুই কিলোমিটার বাড়িয়ে হবিগঞ্জ সদর উপজেলার গদাইনগর এলাকায় সুতাং নদের সঙ্গে মিশিয়ে দেয়। এতে খালের এই বর্জ্য সরাসরি এখন সুতাং নদে গিয়ে পড়ছে। খালটি মূলত সেচকাজে ব্যবহার করছিলেন স্থানীয় কৃষকেরা। শায়েস্তাগঞ্জের অলিপুর এলাকার স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, অপরিকল্পিতভাবে গড়ে উঠা শিল্পকারখানার দূষিত বর্জ্য সুতাং নদীতে ফেলা হচ্ছে। এখানে গড়ে উঠা অধিকাংশ শিল্পপ্রতিষ্ঠানে নেই প্রয়োজনীয় বর্জ্য শোধনাগার (ইটিপি)। যেসব কোম্পানিতে ইটিপি রয়েছে, সেগুলো অতিরিক্ত খরচের ভয়ে নিয়মিত চালানো হচ্ছে না। সরকার ও পরিবেশ অধিদপ্তরকে দেখাতে অনেক কোম্পানি ইটিপি স্থাপন করেছে। কিন্তু এগুলো বন্ধ রেখে কারখানার বর্জ্য ফেলা হচ্ছে সুতাং নদীতে। অথচ শিল্পকারখানাতে ইটিপি ব্যবহার বাধ্যতামূলক। রহস্যজনক কারণে পরিবেশ অধিদপ্তরের দায়িত্বশীলরা এসব দেখেও না দেখার ভান করে আছেন। এর ফলে নদীর তীরবর্তী শায়েস্তাগঞ্জ উপজেলার সুরাবই, আলগাপুর, শৈলজুড়া, সদর উপজেলার রাজিউড়া ইউনিয়নের সাধুরবাজার, ভঙ্গুররহাটি, রাজিউড়া, ফান্দ্রাইল, সানাবই, উচাইল, বেকিটেকা, নাজিরপুর, লুকড়া, লাখাই উপজেলার করাব, বুল্লা, বেগুনাই, বরগান্দিসহ বেশকটি গ্রামে কৃষি, স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও দৈনন্দিন জীবনে ব্যাপক বিপর্যয়ের পাশাপাশি উদ্বেগজনক মানবিক সংকটের সৃষ্টি হয়েছে।
স্থানীয়রা জানান, সুতাং নদীর পানি দূষণে সবচেয়ে বেশি ভূমিকা রয়েছে একাধিক প্রতিষ্ঠানের। তারা অলিপুর এলাকায় বিশাল আয়তন নিয়ে একাধিক শিল্পপ্রতিষ্ঠান স্থাপন করেছেন। এসব প্রতিষ্ঠানের বর্জ্য মাটির নিচ দিয়ে ছোট-বড় পাইপ দিয়ে সরাসরি শৈলজুড়া খালে ফেলা হচ্ছে, আর খালের পানি যাচ্ছে সুতাং নদীতে।
কৃষকরা জানান, এ নদীর পানি ব্যবহার করে লাখাই ও সদর উপজেলার প্রায় ২৭ হাজার হেক্টর জমিতে বোরো চাষাবাদ হতো। বর্তমানে শিল্পদূষণ ও পানি সংকটের কারণে ভূগর্ভস্থ পানির উপর নির্ভর করতে হচ্ছে কৃষকদের। এতে যেমন উৎপাদন খরচ বাড়ছে, অন্যদিকে অনাবাদি থেকে যাচ্ছে অনেক জমি, যা সামগ্রিক উৎপাদনে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।
সম্পূর্ণ সংবাদ ও সর্বশেষ তথ্যের জন্য মূল প্রকাশনায় দেখুন।
মূল সংবাদ দেখুন ↗


