
সম্পর্কে আত্মতুষ্টির নতুন এক ট্র্যাপের নাম ‘ম্যানকিপিং’
প্রেম বা দাম্পত্যের সূচনাটা সবসময়ই এক ধরণের ঘোরের মতো থাকে। দুজন মানুষের প্রথম দিকের কথোপকথন, অনুভূতির আদান-প্রদান এবং পারস্পরিক খেয়াল রাখার মানসিকতা দিয়ে গড়ে ওঠে সম্পর্কের বুনিয়াদ। তবে সময় যতই গড়ায়, অনেক সম্পর্কের মধ্যেই অলক্ষ্যে এক অদ্ভুত স্থবিরতা এবং অসমতা বাসা বাঁধতে শুরু করে। বিশ্বজুড়ে সম্পর্ক বিশেষজ্ঞরা আধুনিক সম্পর্কের এই নতুন রূপবিদ্যা বা মনস্তাত্ত্বিক সংকটকে নাম দিয়েছেন ‘ম্যানকিপিং’। পরিভাষাটি শুনতে নতুন হলেও এর চর্চা বেশ পুরনো এবং ক্ষতিকর। সহজ কথায়, কোনো এক পক্ষের উদাসীনতা, পরিপক্বতার অভাব বা অলসতার কারণে সঙ্গী যখন অবলীলায় ‘অভিভাবক’ বা মা/বাবার ভূমিকায় অবতীর্ণ হন এবং সঙ্গীর জীবন, ব্যবহার ও ব্যক্তিগত কাজ গুছিয়ে দেওয়ার একক দায়ভার কাঁধে তুলে নেন, তাকেই বলা হয় ম্যানকিপিং। এটি শুধু একজন মানুষকে শারীরিকভাবে ক্লান্ত করে তোলে না, বরং মানসিকভাবে পুরোপুরি নিঃশেষ করে দেয়। একসময় যে সম্পর্কে ভালোবাসা ছিল প্রধান নিয়ামক, তা রূপ নেয় কেবল দায়িত্ব পালনের এক চরম ক্লান্তি আর অসন্তোষের প্রতিযোগিতায়।
ম্যানকিপিং বলতে কিন্তু কেবল ঘরের ছোটখাটো কাজ বা বাজার করা গুছিয়ে দেওয়াকে বোঝায় না। এর মূল জায়গাটা হলো মানসিক ও আবেগীয় শ্রম বা ‘ইমোশনাল লেবার’। অনেক সম্পর্কে দেখা যায়, একজন সঙ্গী তার আবেগ প্রকাশ করতে জানেন না, জীবনের সিদ্ধান্ত গ্রহণে চরম দ্বিধাদ্বন্দ্বে ভোগেন কিংবা জীবনের দৈনন্দিন শৃঙ্খলা রক্ষায় ভীষণভাবে অনিচ্ছুক। তখন অপর সঙ্গীকে সবসময় গাইড বা নির্দেশক হিসেবে কাজ করতে হয়। তিনি কখন কী খাবেন, বন্ধুদের সাথে কীভাবে কথা বলবেন, পরিবারের সামাজিক অনুষ্ঠানে উপস্থিত থাকবেন কি না, এমনকি তার কর্মক্ষেত্রের মেজাজ সামলানোর দায়িত্বও অবলীলায় অন্যজন নিজের কাঁধে নিয়ে নেন। শুরুতে অনেক নারী বা পুরুষ ভালোবেসে বা সঙ্গীকে ‘সহযোগিতা’ করার তাগিদে এই কাজগুলো করতে শুরু করেন। তারা মনে করেন এটি সম্পর্কেরই একটি স্বাভাবিক অংশ। কিন্তু ধীরে ধীরে তা একটি স্থায়ী নিয়মে পরিণত হয়। একজন সঙ্গী পরিণত হন সবদিক সামলে রাখা দায়িত্বশীল অভিভাবকে, আর অন্যজন রয়ে যান পরম নির্ভরতায় আরাম নেওয়া এক অপক্ব প্রাপ্তবয়স্কে। এর ফলে সম্পর্কের স্বাভাবিক রোমান্স, সমতা এবং আকর্ষণ ধূলিসাৎ হয়ে যায়।
একটি ভারসাম্যপূর্ণ সম্পর্কের মূল চাবিকাঠি হলো পারস্পরিক আদান-প্রদান এবং আত্মনির্ভরশীলতা। কিন্তু ম্যানকিপিং যেখানে বাসা বাঁধে, সেখানে সম্পর্কের রোমান্টিক সমীকরণটি মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। আপনি যখন প্রতিনিয়ত সঙ্গীর জামাকাপড় কোথায় আছে তা খুঁজে দেওয়া থেকে শুরু করে তার মন মেজাজ ভালো রাখার সব রকমের সমাধান একাই তৈরি করে দেবেন, তখন নিজের মানসিক স্বাস্থ্যের যত্ন নেওয়ার সময় বা সুযোগ আপনার আর থাকবে না। এটি সম্পর্কের মাঝে এক ধরণের অদৃশ্য ক্ষোভ বা রেজেন্টমেন্ট তৈরি করে। যে সঙ্গী সবসময় সব গুছিয়ে দিচ্ছেন, তিনি ধীরে ধীরে অনুভব করতে শুরু করেন যে তিনি একজন রোমান্টিক পার্টনারের জায়গায় কেবল একজন কেয়ারটেকার বা তত্ত্বাবধায়ক হিসেবে জীবন কাটাচ্ছেন। অন্যদিকে, যার ওপর এই চর্চা চালানো হচ্ছে বা যিনি নিজে থেকে দায় নিচ্ছেন না, তিনিও একসময় নিজেকে নিয়ন্ত্রিত এবং ছোট মনে করতে পারেন। দীর্ঘমেয়াদে এই আচরণ দুই মেরুর মধ্যে এমন এক মানসিক দূরত্ব তৈরি করে, যা বড় কোনো ঝগড়া ছাড়াই একটি সুন্দর সম্পর্ককে নীরব ভাঙনের দিকে ঠেলে দেয়।
Read the complete and latest report on the publisher’s website.
View Original Article ↗